*
Categories
Menu
pashon1
পৃথিবীর সুন্দরতম ফুল- প্যাশন ফুল
জুন 30, 2016 আবহাওয়া- পরিবেশ
FacebookTwitterGoogle+Share

pashon1মামুন বিল্লাহ, ঢাকা, ৩০ জুন ২০১৬ঃ পৃথিবীর সুন্দরতম ফুল বলে পরিচিত প্যাশন ফুল(passion)।
খাগড়াছড়ির সূর্য চাকমার বাড়ির আঙিনায় ঢুকলেই মনকাড়া ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। ঘ্রাণের উৎস দুটো আমগাছ বেয়ে ওঠা আরোহী লতা। খাঁজকাটা পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে মসৃণ সবুজ ফল। শখের বসে লাগানো ফলের স্বাদে মুগ্ধ এলাকাবাসীকে বীজও বিলিয়েছেন। গ্রামে গ্রামে এখন দেখা মিলছে এই ফলের।
নাম প্যাশন। বাংলা করলে দাঁড়ায় অনুরাগ। ফলটির এমন নামকরণই বলে দেয় এর কদর আছে বিশ্বজুড়ে। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের শিজক গ্রামের সূর্য চাকমার কল্যাণে বাঘাইছড়িতেও প্যাশন ফলের অনুরাগীর সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের সি ব্লক, বাঘাইছড়ি ইউনিয়নে উগলছড়ি ও বাঘাইছড়ি, খেদারমারা ইউনিয়নে পাবলাখলী, সারোয়াতলী ইউনিয়নে হিরাচর ও পৌর শহরের বাবুপাড়া গ্রামসহ ১০ থেকে ১৫টি গ্রামে এই ফলের চাষ হচ্ছে।
pashon flowerসূর্য জানান, ২০০৭ সালে এক আত্মীয়ের কাছ থেকে বীজ এনে লাগিয়েছিলেন আঙিনায়। বিনা যত্নেই গাছটি বেড়ে উঠেছে। ফল দিয়েছে দুই বছরের মাথায়। এখন দুটো গাছে বছরে দুবার করে ফল ধরে।
পাকলে হলুদ রং ধারণ করে। ভেতরে অসংখ্য বীজ আবৃত করে থাকে জেলির মতো হলুদ মণ্ড। স্বাদ টক-মিষ্টি। এই ফলের শরবত খেতে দারুণ সুস্বাদু বলে জানালেন তিনি। বিশেষ করে গরমে ক্লান্তি দূর করে দ্রুত। তা ছাড়া প্রচুর ভিটামিন থাকে বলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়।
তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের অনেকে ফলটি খেয়ে বীজ লাগিয়েছেন। বিনা মূল্যে তিনি বীজও বিলিয়েছেন গ্রামবাসীর মধ্যে। এখন প্যাশন ফল বাঘাইছড়ির বিভিন্ন গ্রামে সহজলভ্য। বাণিজ্যিকভাবে চাষ না হলেও লোকজনের বাড়ির আঙিনায় দেখা মিলছে এই ফলের।
ঝুমকোলতা আর প্যাশন একই পরিবারভুক্ত উদ্ভিদ। নাম ‘প্যাসিফ্লোরেসি’। এরা লতাজাতীয় উদ্ভিদ। এ পরিবারে অনেক প্রজাতি আছে। এর মধ্যে ‘প্যাসিফ্লোরা’র একটি প্রজাতিতে বৃত্তাকার ফল হয়। এটিই প্যাশন ফল, যা আমাদের এখানে ‘ট্যাং ফল’ নামেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায় তাঁরবাংলার বিচিত্র ফল বইতে লিখেছেন, ফলটির ইংরেজি নাম Passion fruit।
passion fruitএ লতাটি তার অবলম্বনকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে বলেই বিজ্ঞানীরা এ নামকরণ করেছেন। এর বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora edulis var. flavicarpa। খাগড়াছড়ির কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাজহারুল করিম জানান, তাঁরা পাহাড়ে প্যাশন ফল চাষে কেবল সফলই হননি, এ দেশের আবহাওয়ার উপযোগী একটি জাতও উদ্ভাবন করেছেন বারি প্যাশন-১ নামে (এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত আগের প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছে)।
এবার প্রসঙ্গ ঝুমকোলতার। এর ফুলের একটি নাম ‘শঙ্খচক্রগদাপদ্ম’! বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora caerulea। সারা বিশ্বেই প্যাসিফ্লোরেসি পরিবারের এ লতাগুলো তাদের নান্দনিক আকার-আকৃতি ও ফুলের মনোহর রূপ-লাবণ্যের কারণে সমাদৃত। বাগানে বাগানে তাদের সযতন পরিচর্যা। ঝুমকোলতায় রচিত তোরণ বাগানের শোভায় যোগ করে বাড়তি মাত্রা। বিশেষত বর্ষায় বৃষ্টিভেজা নিবিড় সবুজ লতার পটভূমিতে গাঢ় বেগুনি-সাদা বিচিত্র গড়নের ফুলগুলোর দিকে তাকালে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।
pashonনিসর্গী দ্বিজেন শর্মা তাঁর ফুলগুলি যেন কথা বইতে উল্লেখ করেছেন, প্যাসিফ্লোরা প্রজাতিটির আদি নিবাস ব্রাজিলে। প্যাশন ফল এসেছে হাল আমলে, কিন্তু ঝুমকোলতার এ দেশে অভিযোজন বহুকালের। শঙ্খচক্রগদাপদ্ম নামটিও নিশ্চয় তার একটি প্রমাণ। চিরসবুজ ঘন পল্লব সন্নিবেশিত লতা। সে কারণেই বাগানের তোরণের জন্য আদর্শ। ঝুমকোলতা আর প্যাশনের পাতার গড়ন একই রকম। পাতায় তিন থেকে পাঁচটি বিভক্তি। বর্ষা ছাড়া গ্রীষ্মেও ঝুমকোলতার ফুল ফোটে। তবে বর্ষাতেই ফুলের আধিক্য। বৃষ্টিভেজা হাওয়ায় মিষ্টি সৌরভ ছড়িয়ে ফুলগুলো জানিয়ে দেয় তাদের ফুটে ওঠার বার্তা। শিকড় থেকে সহজেই এর চারা গজায়। নার্সারিগুলোতে চারা কিনতেও পাওয়া যায়। টবেও লাগানো যায়। ঝুমকোলতার ফল নেই, তবে বাড়িতে আনলে রূপে-সৌরভে সে বঞ্চিত করবে না নিসর্গানুরাগীদের।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্যাশন দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও আফ্রিকার ফল। আরোহী বা লতাজাতীয় এই গাছ মাচা, ঘরের ছাদ ও গাছ বেয়ে ওপরে ওঠে। বছরে দুবার ফলন পাওয়া যায়। প্রথমবার জুলাই-আগস্ট মাসে, দ্বিতীয়বার ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। গাছ লাগানোর ১৪-২০ মাসের মধ্যেই ফল ধরে। ১৮-২০ মাস বয়সের একটি গাছে ১০০-২০০টি ফল পাওয়া যায় অর্থাৎ গাছ প্রতি ৫-১০ কেজি ফল মেলে।
এই ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম রয়েছে। ফল থেকে শরবত ছাড়াও এর মণ্ড প্রক্রিয়াজাতকরণ করে আইসক্রিম, জুস, স্কোয়াশ, জ্যাম ও জেলি প্রস্তুত করা যায়। বীজ ও খোসা থেকে পেকটিন ও উচ্চ মাত্রার লিনোলিক অ্যাসিড–সমৃদ্ধ তেল তৈরি করা সম্ভব।
উদ্ভিদ পরিচিতি:
প্যাশনফল Passifloraceae পরিবার এবং Passiflora জেনাসের অন্তর্গত। প্যাশনফল সাধারণত তিন ধরনের হয় যেমন বেগুনী (পার্পল) প্যাশন ফল passiflora edulis var edulis , হলুদ প্যাশনফল P. edulis var . flavicarpaএবং হাইব্রিড Tainon No1। পার্পল প্যাশনফল হতে প্রাকৃতিক মিউটেশনের মাধ্যমে হলুদ প্যাশনফল উৎপত্তি হয়েছে যা আকারে ও গুণাগুণে মাতৃপার্পল প্যাশনফল হতে উন্নত। ফুল উভয়লিঙ্গ ধরনের এতে পাঁচটি বৃত্যংশ, পাঁচটি সাদাটে পাপড়ি থাকে, বেগুনী রঙের দুই সারি সুতোর মত পুংকেশর থাকে এবং tripartite ধরনের স্ত্রীকেশর থাকে। ফল গোলাকার, ৪-৬ সেমি লম্বা, পাকলে সবুজাভ হলুদ বা বেগুনী এবং মসৃণ হয়। বীজ কাল বা বাদামী ধরনের হয়, প্রতিটি বীজ হলুদ বা কমলা রঙের সুগন্ধি রসালো পাল্প দ্বারা বেষ্ঠিত থাকে। প্যাশনফল বীজ এবং কাটিং উভয় পদ্ধতির মাধ্যমে চাষ করা যায়।
প্যাশন ফল থেকে উৎপাদিত খাদ্যসমূহ:
প্যাশন ফলের বীজকে আবৃত করে থাকা হলুদ, জিলাটিনাস, সুগন্ধিযুক্ত পাল্পকে পানিতে দ্রবীভূত করে খুবই উপাদেয় শরবৎ প্রস্তত করা যায়। এটিকে অন্যান্য জুসের সাথেও মিশ্রিত করে খাওয়া যায়। পাল্পকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে আইসক্রীম, জুস, স্কোয়াশ, জ্যাম ও জেলি প্রস্তত করা যায়। বীজ ও খোসা হতে পেকটিন ও উচ্চ মাত্রার লিনোলিক এসিড সমৃদ্ধ তেল আহরণ করা সম্ভব।
প্যাশনফলের পুষ্টিগুন:
প্যাশনফল ভিটামিন ‘‘সি” সমৃদ্ধ ফল। প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য বা পাল্প অংশে বিদ্যমান বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ হলোঃ
খাদ্যেপাদান পরিমাণ
পানি (গ্রাম) ৮৪.৯
আমিষ (গ্রাম) ০.৭
চর্বি (গ্রাম) ০.২
শর্করা (গ্রাম) ১৩.১
আঁশ (গ্রাম) ০.৫
ক্যালসিয়াম (মিলিগ্রাম) ৩.৮
ফসফরাস (মিলিগ্রাম) ২৪.৬
লৌহ (মিলিগ্রাম) ০.৪
ভিটামিন এ (আ: একক) ২৪১০
রাইবোফ্লোবিন (মিলিগ্রাম) ০.১
নিয়াসিন (মিলিগ্রাম) ২.২
ভিটামিন সি (মিলিগ্রাম) ২০.০
খাদ্যশক্তি (কিলোজুল) ৩৮৫.০

মন্তব্য

Comments are closed
Mobile Version | Desktop Version